লালমনিরহাটের আদিতমারীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কারকাজ শুরু করে পাঁচ মাস ধরে ফেলে রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কয়েক দফা চিঠি দিয়েও তাদের কাজে ফেরাতে পারেনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বর্ষায় খোঁড়াখুঁড়ি অবস্থায় পড়ে থাকা সড়কটি এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা গেছে, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, ভাদাই ও পলাশী ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক মহিষখোচা-বুড়িরহাট জেসি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খানাখন্দে ভরে যায়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পর গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি।
দরপত্রের মাধ্যমে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় কাজ পায় লালমনিরহাট সদর উপজেলার ভোলার চওড়া এলাকার মেসার্স শাকিল ট্রেডার্স।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, নিয়মানুযায়ী দরপত্র শেষে গত ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি মোতাবেক ১৮ জানুয়ারি কাজ শুরু করে ২৬ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু সড়ক খুঁড়ে, কিছু গাইডওয়াল নির্মাণ করে এবং প্রায় ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্নের পর প্রথম বিল হিসেবে ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ আর শুরু হয়নি। ফলে বর্ষার বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জনদুর্ভোগ বেড়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘব ও এলজিইডির সুনাম রক্ষায় একাধিকবার চিঠি দিয়েও কাজে ফেরাতে পারেনি স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর।
স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ১১ শতাংশ লাভে কাজটি কিনে নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আমিনুর ইসলামের ভাই আলম কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ওই লাভের হিসাব ধরে কাজ করলে লোকসান হবে বুঝতে পেরে তিনি কাজ বন্ধ করে দেন। এ কারণে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও এলজিইডির কোনো চিঠির জবাব দিচ্ছে না। ফলে কাজটি বাস্তবায়ন করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। যানবাহনের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে দ্রুত সড়কটির সংস্কার শেষ করা হোক।
স্থানীয় স্কুলছাত্রী সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘প্রতিদিন অটোরিকশায় এ পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। অটোরিকশায় উঠলেই ভয় লাগে। অটোরিকশা শুধু কাঁপে; কখন যে গর্তে পড়ে হাত পা ভেঙে যায়, সেই আশঙ্কায় থাকি।’
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শাওন বলেন, তিন-চার বছর ধরে ভাঙা সড়ক দিয়ে চলাচল করেছি। দীর্ঘ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু কাজ শুরুর পরই ঠিকাদার চলে যাওয়ায় এখন আগের চেয়েও কয়েকগুণ দুর্ভোগ বেড়েছে। এখন মনে হয়, আগের খানাখন্দরই ভালো ছিল, মাঝে মধ্যে গর্ত থাকলেও কিছু স্থান ভাল ছিল; এখন পুরো পথেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দ্রুত সড়কটির সংস্কারের দাবি করেন তিনি।
মহিষখোচার ব্যবসায়ী গোলাম কবির বলেন, সড়কটি খুড়ে রাখায় ৫ মাস ধরে বড় ট্রাক ঢুকছে না। ফলে ছোট ট্রাকে পণ্য আনতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে গেছে। একটি সড়ক সংস্কার করতে যদি ৬ মাস সময় লাগে। তাহলে ব্যবসা বাণিজ্য করব কীভাবে?
অভিযোগের বিষয়ে নির্মাণকাজ পরিচালনাকারী আলম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। বৃষ্টি শেষ হলে আবার কাজ শুরু করা হবে।’
আদিতমারী উপজেলা প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক বলেন, আমরা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কয়েক দফায় চিঠি দিয়েছি কাজ সমাপ্ত করার জন্য, কিন্তু তারা সাড়া দিচ্ছে না। কাজটি দ্রুত সমাপ্ত করতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম বলেন, জনদুর্ভোগের বিষয়টি জেনেছি। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ওই ঠিকাদারকে অফিসে ডেকে এনে চাপ প্রয়োগ করেছি। তিনি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় কাজ শুরু করে দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশা করছি, দ্রুতই মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে।